মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কর্তৃক ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আজ (২৭ আগস্ট, ২০২৫) থেকে কার্যকর হয়েছে। এই পদক্ষেপটি ভারতের অর্থনীতিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, বিশেষত দেশটির রপ্তানি খাতে।
শুল্ক আরোপের কারণ ও প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাশিয়া থেকে ভারত ছাড়কৃত মূল্যে তেল কেনা অব্যাহত রাখায় এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে পরোক্ষভাবে অর্থায়নে সহায়তা করছে। পূর্বে আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্কের সাথে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ যোগ হওয়ায় মোট শুল্কের পরিমাণ ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই উচ্চ শুল্কের কারণে ভারতের রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলো, যেমন - তৈরি পোশাক, হীরা, গয়না এবং সামুদ্রিক খাদ্য খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যার প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি এই নতুন শুল্কের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (GTRI) এর অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি মূল্য ৪৩ শতাংশ কমে ৫০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যেতে পারে এবং এটি ভারতের জিডিপি প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস করতে পারে। এর ফলে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যেই, ভারতীয় রুপি অবমূল্যায়িত হয়েছে এবং শেয়ারবাজার (সেনসেক্স ও নিফটি) ১ শতাংশ কমে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে। ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ ও চীনের মতো দেশগুলো কম শুল্কের কারণে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক কৌশল
এই অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি 'আত্মনির্ভর ভারত' (স্বনির্ভর ভারত) গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দেশীয় উৎপাদন ও ভোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। মোদি সরকার কর কমানো এবং পণ্য ও পরিষেবা কর (GST) কাঠামোকে সরলীকরণ ও হ্রাস করার পরিকল্পনা করছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই কর ছাড়ের ফলে ভোক্তা খাতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রবাহ তৈরি হতে পারে। সুইস বিনিয়োগ ব্যাংক ইউবিএসের মতে, জিএসটি কমানোর এই সিদ্ধান্ত কর্পোরেট ও আয়কর কমানোর চেয়েও বড় প্রভাব ফেলবে।
এছাড়াও, ভারত সরকার ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি চীন, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মতো বিকল্প বাজারে রপ্তানি বাড়াতে উৎসাহিত করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। যদিও এই শুল্ক ভারতের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা, তবে ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা এই ক্ষতি কিছুটা সামলে নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মরগান স্ট্যানলি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে মোদির আর্থিক প্রণোদনা জিডিপি বৃদ্ধি করবে এবং মুদ্রাস্ফীতি কমাবে। এমনকি, চলমান সংকটের মধ্যেও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ভারতের সার্বভৌম ঋণমান উন্নত করেছে। ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার আরও কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করতে পারে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্বে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।