গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতীয় অর্থনীতি এবং ব্যবসা খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কার পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: একটি নতুন দিগন্ত
বিশ্বজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির চাপের মুখে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার ব্যাপারে একমত হয়েছে। উভয় পক্ষই চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি সফল হলে দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চুক্তির ১৪তম দফার বৈঠক আগামী ৬-১০ অক্টোবর ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন যে ভারত ও ইইউ একে অপরের পরিপূরক এবং উভয় পক্ষেই বিশাল সুযোগ বিদ্যমান।
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক: শুল্ক এবং ভুট্টার অচলাবস্থা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বাণিজ্য নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে, বিশেষ করে শুল্ক আরোপ এবং মার্কিন ভুট্টা আমদানিতে অস্বীকৃতি জানানোর জন্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০% শুল্ক আরোপ করেছেন (২৫% সাধারণ বাণিজ্য ঘাটতির জন্য এবং আরও ২৫% রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখার কারণে), যা গত ২৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বিমান রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ১২% এবং সেপ্টেম্বরে আরও ১৪% পতন হয়েছে। প্রায় ৪৮.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভারতীয় রপ্তানি বর্তমানে এই ৫০% শুল্কের আওতায় রয়েছে, যা বস্ত্র, গয়না, রাসায়নিক এবং পাদুকা সহ শ্রম-নিবিড় খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সতর্ক করেছেন যে এই শুল্ক চলতি অর্থবছরে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধি ০.৫-০.৬% কমিয়ে দিতে পারে। তবে, ফিচ (Fitch) এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে এই শুল্ক ভারতের অর্থনীতির ততটা ক্ষতি করেনি যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল এবং সংস্থাটি ভারতের বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৫% থেকে বাড়িয়ে ৬.৯% করেছে। এছাড়াও, মার্কিন ভুট্টা (বিশেষ করে জিএম ভুট্টা) আমদানি না করার বিষয়টি ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনায় একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ভারতের কৃষি খাতের জন্য রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
নতুন জিএসটি কাঠামো এবং অর্থনৈতিক গতি
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ঘোষণা করেছেন যে নতুন জিএসটি কাঠামো আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। তিনি আশা করছেন যে এই সংস্কার অর্থনীতিতে ২ লক্ষ কোটি টাকা যোগান দেবে। এই সংস্কারের ফলে ৯৯% পণ্য ৫% জিএসটি-এর আওতায় আসবে এবং ৯০% পণ্য ১৮% জিএসটি-এর আওতায় আসবে (যা আগে ২৮% ছিল)। অর্থমন্ত্রী বিশ্বাস করেন যে এই পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষের সাশ্রয় হবে, যা তারা পণ্য ক্রয়ে ব্যয় করবে এবং এটি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।
কর স্বর্গে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ
রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বিদেশে সরাসরি বিনিয়োগের (এফডিআই) ৫৬% স্বল্প কর সুবিধার দেশগুলিতে, যা 'ট্যাক্স হ্যাভেন' নামে পরিচিত, পরিচালিত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য এবং সুইজারল্যান্ড এই দেশগুলির মধ্যে অন্যতম।
বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য নির্ভরশীলতা
রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩.৭৯% বৃদ্ধি পেয়ে ১১৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। পেঁয়াজ, চাল, তুলা এবং বিদ্যুতের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের জন্য বাংলাদেশের ভারতের উপর নির্ভরশীলতা এখনও অনেক বেশি। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ১৪৯ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে।