মার্কিন শুল্ক ও ভারতের জিডিপি:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০% শুল্ক আরোপের ফলে চলতি অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি প্রায় ০.৫% কমতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন। তবে, তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই অতিরিক্ত শুল্ক একটি স্বল্পস্থায়ী ঘটনা হবে। যদি এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদী হয়, তবে এর প্রভাব আরও "ব্যাপক" হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। উল্লেখ্য, এই শুল্কের মধ্যে ২৫% রাশিয়ার থেকে তেল কেনার 'জরিমানা' হিসেবে চাপানো হয়েছে। যদিও ট্রাম্পের এই শুল্কনীতির জেরে বস্ত্র, গহনা, সামুদ্রিক খাদ্য এবং চামড়ার মতো কিছু শিল্পে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারত ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, নাগেশ্বরন চলতি অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের ৬.৩-৬.৮% জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাসে সহমত পোষণ করেছেন। তিনি জানান, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) জিডিপি ৭.৮% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি:
অর্থনীতিতে গতি আনতে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে ভারত সরকার শতাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যে কর হ্রাস করেছে। জিএসটি কাঠামোকে চার স্তরের পরিবর্তে দুই স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। টুথপেস্ট ও শ্যাম্পুর উপর কর ১৮% থেকে কমিয়ে ৫% এবং ছোট গাড়ি, এয়ার কন্ডিশনার ও টেলিভিশনের উপর কর ২৮% থেকে ১৮% করা হয়েছে। এছাড়া, ব্যক্তিগত জীবনবীমা ও স্বাস্থ্যবীমা সেবার উপর থেকে পুরোপুরি জিএসটি তুলে নেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলি আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
শেয়ারবাজারের অবস্থা:
সোমবার ভারতীয় ইক্যুইটি বেঞ্চমার্ক সূচকগুলি (Nifty50 এবং BSE Sensex) ইতিবাচক ধারায় শেষ হয়েছে। নিফটি৫০ ০.১৩% বৃদ্ধি পেয়ে ২৪৭৭৩.১৫ পয়েন্টে এবং বিএসই সেনসেক্স ০.০৯% বৃদ্ধি পেয়ে ৮০৭৮৭.৩০ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে। বিশ্ব বাজারের ইতিবাচক ইঙ্গিত এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা এই বৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে।
বাণিজ্য চুক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:
- ভারত-কাতার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: ভারত ও কাতারের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির রূপরেখা আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চুক্তির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করে ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা।
- ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য আলোচনা: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ১৩তম দফার বাণিজ্য আলোচনা নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে। উভয় পক্ষই এই বছরের শেষ নাগাদ একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়।
- ভারত-ইসরায়েল বিনিয়োগ চুক্তি: ভারত ও ইসরায়েল দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ বাড়াতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ইসরায়েল অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD)-এর প্রথম সদস্য দেশ, যার সঙ্গে ভারত এই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করল। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশংসা করে ভারতীয় অর্থনীতিকে "আকর্ষণীয়" বলে অভিহিত করেছেন।
- চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ক: ২০২৫ সালে চীন ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সতর্ক কিন্তু অর্থবহ পুনর্গঠন দেখা যাচ্ছে। চীন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে এবং ভারত চীনা নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু করেছে, যা নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
- পোশাক ও ইলিশ রপ্তানি: বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ভারতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এছাড়াও, দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ ভারতে ১,২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি করবে।
ভারতের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি:
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু নাগরিকদের প্রতি ভারতকে আবারও আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও জ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভারতীয় অর্থনীতিকে আরও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এবং রপ্তানিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর একটি ভার্চুয়াল ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অনুশীলনে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।